পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ
পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীর একটি সাধারণ কিন্তু
গুরুতর সমস্যা। মনোযোগের অভাবে শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে পড়া বুঝতে পারে না, ফলে
শেখার আগ্রহ ধীরে ধীরে কমে যায়। এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মানসিক চাপ,
প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের অভাব, পারিবারিক
পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সবকিছুই এই সমস্যাকে প্রভাবিত করে।
অমনোযোগ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা ফলাফল, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে
ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সমস্যার মূল কারণগুলো জানা এবং সচেতন হওয়া খুবই
জরুরি।
পোস্টটি শুরু করার আগে আপনাদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যে, অবশ্যই পোস্টটি
শেষ পর্যন্ত পড়বেন এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সম্পর্কে জানবেন এবং তা
সঠিকভাবে প্রয়োগ করবেন। পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ার মাধ্যমে আপনারা এ পোস্টের
গুরুত্বপূর্ণ সব কথাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন এবং তা প্রয়োগ করতে কোন
অসুবিধা হবে না বা প্রয়োগের পরও কোন অসুবিধা হবে না। আপনাদের সুবিধার্থে
পোষ্টের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো পেজ সূচিপত্র আকারে তুলে ধরা হলো।
পেজ সূচিপত্র:পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ
- পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়া:মূল ধারণা ও গুরুত্ব
- শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও আবেগগত সমস্যা
- মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার
- পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের অভাব
- ভুল পড়াশোনার পদ্ধতি ও সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি
- পারিবারিক পরিবেশ ও অভিভাবকের ভূমিকা
- শারীরিক সমস্যা ও অপর্যাপ্ত ঘুম
- বন্ধু মহল ও সামাজিক প্রভাব
- শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ
- শেষ কথা:পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ
পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ
পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ আজকের দিনে অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের
জন্য বড় চিন্তার বিষয়। অনেক সময় দেখা যায়, বই সামনে থাকলেও মন থাকে
অন্য জায়গায়। এর পেছনে দৈনন্দিন জীবনের বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা কাজ করে।
স্মার্টফোন, গেম, সোশ্যাল মিডিয়া শিক্ষার্থীদের সময় ও মনোযোগ দুটোই কেড়ে
নিচ্ছে।
একই সঙ্গে পড়াশোনার বিষয়গুলো যদি একঘেয়ে লাগে বা বাস্তব জীবনের সঙ্গে
মিল না থাকে, তাহলে আগ্রহ কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক। অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো
ঘুমাতে পারে না, ফলে ক্লাসে বা পড়ার টেবিলে বসে মন ধরে রাখা কঠিন হয়।
পারিবারিক চাপ, অতিরিক্ত প্রত্যাশা বা বাড়ির অশান্ত পরিবেশও মনোযোগ নষ্ট
করতে পারে।
আবার কিছু ক্ষেত্রে ভুল পড়ার কৌশল, পরিকল্পনা ছাড়া পড়া বা সময় ঠিকভাবে
ভাগ না করাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার
চাপ বেশি হওয়ায় শেখার আনন্দ অনেক সময় হারিয়ে যায়। এসব মিলেই ধীরে ধীরে
পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং অমনোযোগ তৈরি হয়, যা নিয়মিত অভ্যাস ও
সচেতনতা ছাড়া সহজে ঠিক হয় না।
শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও আবেগগত সমস্যা
শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও আবেগগত সমস্যা বর্তমান শিক্ষাজীবনের একটি নীরব
কিন্তু গভীর প্রভাব ফেলা দিক। অনেক শিক্ষার্থী বাইরে থেকে স্বাভাবিক
দেখালেও ভেতরে ভেতরে নানা চিন্তায় ভোগে। পড়ার চাপ, ভালো রেজাল্ট করার
দুশ্চিন্তা, বাবা মায়ের প্রত্যাশা আর বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা এসব মিলেই
মাথার ভেতর অস্থিরতা তৈরি হয়।
যখন কেউ বারবার মনে করে সে অন্যদের মতো ভালো করতে পারছে না, তখন ধীরে ধীরে
হতাশা জন্ম নেয়। এই মানসিক চাপ অনেক সময় রাগ, বিরক্তি, একা থাকতে চাওয়া
বা হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো আবেগগত সমস্যায় রূপ নেয়। ঠিকমতো কথা
বলার সুযোগ না পেলে বা অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে না পারলে চাপ আরও বেড়ে
যায়।
কিছু শিক্ষার্থী পড়ার সময় অকারণে ভয় পায়, আবার কেউ পরীক্ষার আগে ঘুমাতে
পারে না। আবেগগত অস্থিরতার কারণে মনোযোগ কমে যায়, স্মরণশক্তি দুর্বল হয়
এবং পড়া মনে রাখতে কষ্ট হয়। স্কুল বা কোচিংয়ের পরিবেশ যদি খুব
প্রতিযোগিতামূলক হয়, তাহলে এই সমস্যা আরও বাড়ে। আবার পরিবারে যদি
বোঝাপড়ার অভাব থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী নিজেকে একা মনে করে।
মানসিক চাপ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা পড়াশোনার প্রতি অনীহা তৈরি করে এবং
দৈনন্দিন আচরণেও প্রভাব ফেলে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজের সমস্যাকে ছোট
করে দেখে, কিন্তু ভেতরের চাপ ধীরে ধীরে জমতে থাকে। এই কারণেই শিক্ষার্থীর
মানসিক অবস্থা বোঝা, তাদের কথা শোনা এবং সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থাকা খুব
জরুরি, যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে শেখার পরিবেশে ফিরে আসতে পারে।
মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার
মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার আজকের
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপর বড় প্রভাব ফেলছে। এখনকার দিনে স্মার্টফোন
প্রায় সবার হাতেই থাকে, আর পড়তে বসার সময়ও নোটিফিকেশন, মেসেজ বা ভিডিও
চোখে পড়ে যায়। শুরুতে মনে হয় দুই মিনিট দেখেই আবার পড়ায় ফেরা যাবে,
কিন্তু সেই দুই মিনিট কখন যে আধা ঘণ্টা হয়ে যায়, অনেক সময় বোঝাও যায়
না।
সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস, শর্ট ভিডিও আর গেম মস্তিষ্ককে দ্রুত আনন্দ দিতে
অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে বইয়ের ধীর পড়া বা লম্বা অধ্যায় শিক্ষার্থীদের
কাছে বিরক্তিকর লাগে। প্রযুক্তির এই অভ্যাস মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে
দেয়। অনেক শিক্ষার্থী রাতে মোবাইল ব্যবহার করতে করতে দেরিতে ঘুমায়, যার
প্রভাব পড়ে পরের দিনের পড়াশোনায়।
ক্লাসে বসে মন বসে না, পড়া মনে রাখতে কষ্ট হয়। আবার অনলাইন কনটেন্ট দেখে
অনেক সময় নিজের পড়াশোনাকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা
মানসিক চাপও বাড়ায়। প্রযুক্তি শেখার জন্য ভালো মাধ্যম হলেও অতিরিক্ত
ব্যবহার পড়ার সময় চুরি করে নেয়। পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় না রেখে
সারাক্ষণ অনলাইনে থাকলে পড়া জমে যায় এবং আগ্রহ কমে।.
ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী বইয়ের চেয়ে স্ক্রিনের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়। এই
অভ্যাস বদলানো সহজ নয়, কারণ প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
তবুও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ না করলে পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো স্বাভাবিক
ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার শেখার কাজে লাগানো জরুরি, না
হলে সেটাই পড়াশোনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে ওঠে।
পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের অভাব
পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের অভাব অনেক শিক্ষার্থীর জন্য নীরবে তৈরি হওয়া একটি
সমস্যা, যা ধীরে ধীরে পড়ার গতি ও ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ছোটবেলায় অনেকেই
কৌতূহল নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ হারিয়ে যায়। এর
বড় কারণ হলো পড়ার বিষয়গুলোর সঙ্গে নিজের জীবনের কোনো মিল খুঁজে না
পাওয়া।
যখন পড়া শুধু মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা আনন্দের বদলে চাপ
হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে পড়াশোনা মানেই শুধু পরীক্ষা আর
নম্বর, শেখার আনন্দ সেখানে আর থাকে না। একই ধরনের বই, একই রুটিন আর একঘেয়ে
ক্লাস আগ্রহ কমিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ বুঝতে না পারার ভয়েও পড়া এড়িয়ে
চলে।
একবার যদি কোনো বিষয় কঠিন মনে হয়, তাহলে ধীরে ধীরে সেই বিষয়ের প্রতি
অনীহা তৈরি হয়। বাড়িতে বা স্কুলে যদি শুধু ভুল ধরা হয়, উৎসাহ না দেওয়া
হয়, তাহলে পড়ার ইচ্ছা আরও কমে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে তুলনা করা বা সব সময়
ভালো করার চাপও আগ্রহ নষ্ট করে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজের পছন্দ বা
দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে পারে না, ফলে পড়াশোনা তাদের কাছে অর্থহীন লাগে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া, ঠিকভাবে সময় ভাগ না করা এবং পড়ার লক্ষ্য
পরিষ্কার না থাকাও আগ্রহের অভাবে ভূমিকা রাখে। যখন পড়াশোনাকে নিজের
ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যায় না, তখন সেটি গুরুত্ব হারায়। এই
অবস্থায় পড়া থেকে দূরে সরে যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আগ্রহ ফিরে আসতে
হলে পড়াকে বোঝার চেষ্টা, ছোট লক্ষ্য ঠিক করা এবং শেখার মধ্যে কিছু আনন্দ
খুঁজে পাওয়া জরুরি। নইলে আগ্রহের অভাব ধীরে ধীরে পড়াশোনাকে পুরোপুরি
পিছনে ফেলে দেয়।
ভুল পড়াশোনার পদ্ধতি ও সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি
ভুল পড়াশোনার পদ্ধতি ও সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি অনেক শিক্ষার্থীর
পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার একটি বাস্তব কারণ। অনেকেই মনে করে বেশি সময়
পড়লেই ভালো ফল হবে, কিন্তু কীভাবে পড়ছে সেটাই আসল বিষয়। কেউ কেউ শেষ
মুহূর্তে সব পড়া একসাথে শেষ করতে চায়, ফলে মাথায় কিছুই ঠিকভাবে বসে না।
আবার অনেকে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই পড়তে বসে, আজ কোন বিষয় পড়বে বা কতটুকু
পড়বে তার স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এর ফলে পড়া এলোমেলো হয় এবং আগ্রহ দ্রুত
হারিয়ে যায়। সময় ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকলে পড়ার সময় বারবার নষ্ট হয়।
কখনো মোবাইল, কখনো টিভি, কখনো অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় চলে যায়।
পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক না থাকলে মনও প্রস্তুত থাকে না। অনেক
শিক্ষার্থী কঠিন বিষয়গুলো এড়িয়ে সহজ অংশেই সময় বেশি দেয়, ফলে পুরো
সিলেবাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবার কেউ শুধু মুখস্থের ওপর নির্ভর করে পড়ে,
বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে না। এতে অল্প সময়ের মধ্যে পড়া ভুলে যাওয়া
স্বাভাবিক।
ঠিকভাবে বিরতি না নিয়ে টানা পড়লেও মন ক্লান্ত হয়ে যায়। পর্যাপ্ত
বিশ্রাম ও পুনরাবৃত্তির অভাবেও শেখা দুর্বল হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা
অন্যের রুটিন দেখে নিজের জন্য সেটাই অনুসরণ করতে চায়, কিন্তু নিজের ক্ষমতা
ও সময় অনুযায়ী পরিকল্পনা করে না। এতে চাপ বাড়ে এবং পড়াশোনা আরও জটিল
মনে হয়। ভুল পড়ার কৌশল ও সময়ের সঠিক ব্যবহার না জানলে চেষ্টা করেও
কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণেই পড়ার পদ্ধতি ও সময় ভাগ
করার বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
পারিবারিক পরিবেশ ও অভিভাবকের ভূমিকা
পারিবারিক পরিবেশ ও অভিভাবকের ভূমিকা শিক্ষার্থীর পড়াশোনার উপর গভীর
প্রভাব ফেলে, যা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। একটি শান্ত ও সহায়ক
পরিবার শিক্ষার্থীর মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে, আর সেই পরিবেশেই
পড়াশোনায় মন বসে। কিন্তু ঘরে যদি নিয়মিত ঝগড়া, আর্থিক টানাপোড়েন বা
অশান্তি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনোযোগ ভেঙে যাওয়াটা স্বাভাবিক।
পড়তে বসেও তার মাথার ভেতর ঘরের কথা ঘুরতে থাকে। অনেক অভিভাবক ভালো ফলের
আশায় অতিরিক্ত চাপ দেন, কিন্তু সেই চাপ অনেক সময় ভয়ের কারণ হয়ে
দাঁড়ায়। সব সময় তুলনা করা, ভুল ধরেই কথা বলা বা নম্বর নিয়ে বকাঝকা করলে
শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারায়। আবার কিছু পরিবারে পড়াশোনার
বিষয়ে একেবারেই খোঁজ নেওয়া হয় না, ফলে শিক্ষার্থী দিকনির্দেশনা ছাড়া
চলতে থাকে।
অভিভাবকের উৎসাহ, সময় দেওয়া এবং কথা শোনার মানসিকতা শিক্ষার্থীর জন্য খুব
গুরুত্বপূর্ণ। একসাথে বসে পড়ার সময় ঠিক করা বা ছোট সাফল্যেও প্রশংসা করা
পড়ার আগ্রহ বাড়ায়। বাড়িতে যদি পড়ার জন্য আলাদা জায়গা না থাকে বা সব
সময় টিভি, মোবাইল চালু থাকে, তাহলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়।
আবার কিছু অভিভাবক নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন, যা
পড়াশোনাকে আনন্দের বদলে বোঝা বানিয়ে ফেলে। শিক্ষার্থীর পছন্দ, দুর্বলতা ও
সক্ষমতা বুঝে পাশে দাঁড়ালে সে নিজেকে একা মনে করে না। পারিবারিক সহযোগিতা
ও অভিভাবকের সচেতন ভূমিকা থাকলে পড়াশোনার চাপ অনেকটাই কমে যায় এবং শেখার
পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে।
শারীরিক সমস্যা ও অপর্যাপ্ত ঘুম
শারীরিক সমস্যা ও অপর্যাপ্ত ঘুম শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় নীরবে বড় বাধা
তৈরি করে। অনেক সময় শিক্ষার্থী নিজেও বুঝতে পারে না যে তার মনোযোগ কমে
যাওয়ার পেছনে শরীরের ক্লান্তি কাজ করছে। নিয়মিত ঘুম না হলে মাথা ভারী
লাগে, চোখ জ্বালা করে, আর পড়তে বসে বারবার ঝিমুনি আসে। রাত জেগে পড়া বা
মোবাইল ব্যবহার করার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
এর ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয় এবং সারাদিন শরীর ঝিমিয়ে থাকে।
ঠিকমতো বিশ্রাম না পেলে স্মরণশক্তি দুর্বল হয়ে যায়, নতুন কিছু বুঝতেও
সময় লাগে বেশি। শুধু ঘুমের অভাব নয়, মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা, পেটের
অস্বস্তি বা দুর্বলতাও পড়ার মনোযোগ নষ্ট করে। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময়
এক জায়গায় বসে পড়ে, ফলে শরীরে ব্যথা তৈরি হয় এবং পড়া আর ভালো লাগে না।
সঠিক খাবার না খাওয়া বা পানি কম পান করলেও শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তখন বই খুললেও মন বসে না। অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন
হয়ে যায়, কিন্তু অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেয় না। পরীক্ষার সময় চাপের
কারণে ঘুম আরও কমে যায়, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে। শরীর ভালো না
থাকলে মনও ঠিকভাবে কাজ করে না, এটা খুব সাধারণ বিষয়।
পড়াশোনায় ভালো করতে হলে শরীরের যত্ন নেওয়া জরুরি। নিয়মিত ঘুম, একটু
হাঁটাচলা আর বিশ্রাম পড়ার শক্তি বাড়ায়। শারীরিক সমস্যা অবহেলা করলে ধীরে
ধীরে পড়াশোনার আগ্রহ কমে যায় এবং মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই
সুস্থ শরীরই মনোযোগ দিয়ে পড়ার প্রথম শর্ত।
বন্ধু মহল ও সামাজিক প্রভাব
বন্ধু মহল ও সামাজিক প্রভাব শিক্ষার্থীর আচরণ ও পড়াশোনার অভ্যাসে নীরবে
বড় ভূমিকা রাখে। কিশোর বয়সে বন্ধুরা হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাছের মানুষ, তাই
তাদের কথা, কাজ আর জীবনযাপন সহজেই প্রভাব ফেলে। যদি বন্ধুমহলে পড়াশোনার
গুরুত্ব কম থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীও ধীরে ধীরে সেই পথে চলে যায়।
আড্ডা, ঘোরাঘুরি বা অনলাইন চ্যাটে সময় কাটানো তখন স্বাভাবিক মনে হয়, আর
পড়া পিছিয়ে পড়ে। অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চাপে নিজের
ইচ্ছার বিরুদ্ধেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কেউ কেউ পড়তে চাইলে তাকে নিয়ে মজা
করা হয়, এতে সে লজ্জা পায় এবং আগ্রহ হারায়। আবার সোশ্যাল পরিবেশে সব
সময় নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হয়।
কে কতটা জনপ্রিয়, কার কাছে কী আছে এসব ভাবনা পড়ার মনোযোগ নষ্ট করে। কিছু
শিক্ষার্থী বন্ধুদের অভ্যাস নকল করতে গিয়ে রাত জাগা, অনিয়মিত জীবন বা
দায়িত্বহীন আচরণে জড়িয়ে পড়ে। এতে পড়াশোনার রুটিন ভেঙে যায়। তবে সব
প্রভাব যে খারাপ তা নয়। ইতিবাচক বন্ধু থাকলে পড়ার আগ্রহও বাড়তে পারে।
একসাথে পড়া, একে অন্যকে উৎসাহ দেওয়া বা লক্ষ্য ঠিক করে এগোনো অনেক উপকারে
আসে। সমস্যা হয় তখনই, যখন সামাজিক পরিবেশে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। পারিবারিক
নজরদারি কম থাকলে বা সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে শিক্ষার্থী ভুল পথে যাওয়ার
ঝুঁকিতে থাকে। সমাজের প্রত্যাশা, ট্রেন্ড আর চারপাশের কথাবার্তাও মনে চাপ
তৈরি করে। এই চাপ সামলাতে না পেরে পড়াশোনা থেকে মন সরে যায়। তাই বন্ধুমহল
বাছাই, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি।
সুস্থ সামাজিক পরিবেশ থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা অনেক সহজ হয়ে
যায়।
শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ
শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ অনেক শিক্ষার্থীর
পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান
শিক্ষাব্যবস্থায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার ওপর বেশি জোর
দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয় বুঝে শেখার সুযোগ কম পায়। পাঠ্যসূচি
অনেক সময় বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পায় না, তাই পড়া তাদের কাছে
অর্থহীন মনে হয়।
একই সঙ্গে একাধিক বিষয়ে অতিরিক্ত সিলেবাস থাকায় শিক্ষার্থীরা চাপে পড়ে
যায়। সময়ের মধ্যে সব শেষ করার তাগিদে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়। অনেক
ক্লাসে শিক্ষক-কেন্দ্রিক পড়ানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করা বা মত
প্রকাশের সুযোগ কম থাকে। এতে কৌতূহল ধীরে ধীরে নষ্ট হয়। আবার
পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের কারণে সবাই শুধু নম্বরের পেছনে ছোটে।
কে কতটা বুঝল, সেটা গুরুত্ব পায় না। এই ব্যবস্থায় দুর্বল শিক্ষার্থীরা
আরও পিছিয়ে পড়ে, কারণ তাদের আলাদা করে বোঝার সুযোগ থাকে না। পাঠ্যবইয়ের
ভাষা অনেক সময় কঠিন হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীর বুঝতে কষ্ট হয়। ব্যবহারিক
শেখার অভাব থাকায় পড়া জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে একই
ধরনের বিষয় বারবার পড়ানো হয়, যা একঘেয়েমি তৈরি করে।
আবার নতুন কিছু শেখার সুযোগ সীমিত থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি সহায়ক
পরিবেশ না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা ভয় পেয়ে যায়। ভুল করলে বকাঝকা বা
অপমানের আশঙ্কায় তারা আগ্রহ হারায়। ধীরে ধীরে পড়াশোনা একটি চাপের কাজে
পরিণত হয়। এই সব মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচির সীমাবদ্ধতা
শিক্ষার্থীর মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং পড়ার প্রতি অনীহা তৈরি করে, যা
দীর্ঘমেয়াদে তাদের শেখার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ কথা:পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ
পড়াশোনায় অমনোযোগী হওয়ার কারণ বিভিন্ন দিক থেকে দেখা যায়, এবং
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এই সমস্যা কোনো একক কারণে হয় না। শিক্ষার্থীর
মানসিক চাপ, বন্ধু মহল, পরিবারের পরিবেশ, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার,
ঘুমের অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা-all মিলেই মনোযোগ হারানোর বড়
কারণ।
অনেক সময় শিক্ষার্থী নিজেও বুঝতে পারে না কেন বই পড়ার সময় মন থাকে অন্য
জায়গায়। আমার মতে, সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে দৈনন্দিন অভ্যাস এবং সময়
ব্যবস্থাপনা। যদি পড়ার জন্য সঠিক সময় ঠিক করা হয়, পর্যাপ্ত বিশ্রাম
নেওয়া হয় এবং মোবাইল বা অনলাইন ডিস্ট্রাকশন কমানো হয়, মনোযোগ অনেকাংশে
ফিরে আসে। এছাড়া পরিবার ও শিক্ষকদের উৎসাহ ও সমর্থন শিক্ষার্থীর আগ্রহ
বাড়াতে সাহায্য করে।
ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করে ধাপে ধাপে শেখা, পাশাপাশি নিজের দুর্বলতা ও আগ্রহ
অনুযায়ী পড়াশোনা করা অনেক সময় কার্যকর হয়। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের
জন্য মনোযোগ ধরে রাখা এবং আগ্রহ বজায় রাখা সম্ভব, যদি তারা নিজেদের
জীবনশৈলী ও পড়ার পদ্ধতি সচেতনভাবে ঠিক করে। পড়াশোনায় মনোযোগের অভাবকে
সমস্যার বদলে সুযোগ হিসেবে দেখে পরিকল্পনা করা গেলে ফলাফলে উন্নতি আসা
স্বাভাবিক। তাই মনোযোগ হারানোর কারণ বোঝা ও তা মোকাবেলা করা অত্যন্ত জরুরি।



লাইফ ব্লেন্ড আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url